করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে কারাগারেও

0
53

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই কারাগারগুলোর বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাতে পাল্টে গেছে কারাগারের সামনের চিরচেনা চেহারা। সেখানে এখন আর নেই দর্শনার্থীদের ভিড়।

এদিকে করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে ভার্চুয়াল আদালতে জামিনের হার বাড়ায় কারাগারে বন্দির সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে বলে জানিয়েছেন কারা কর্মকর্তারা।

সারা দেশে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি এবং কাশিমপুরে চারটিসহ মোট ৬৮টি কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারের বন্দি ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৪২ হাজার। সেখানে থাকতেন ৯০ হাজারের মতো বন্দি।

তবে করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে সেই চিত্র পাল্টে যাওয়ার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল আবরার হোসেন বলেন, ভার্চুয়াল আদালত চালুর পর প্রায় ২৭ হাজার আসামির জামিন হওয়ায় কারাগারগুলোতে বন্দির চাপ অনেক কমে গেছে।

তিনি জানান, এই ২৭ হাজার জামিনের বিপরীতে এসেছে আট হাজারের মতো। প্রতিদিন কিছু কম বেশি এসে থাকে।

আবরার হোসেন বলেন, “দেশের কারাগারগুলোতে এক সময় ৯৬ হাজার বন্দিও ছিল। এখন অনেক কম। যে সময়ের মধ্যে এই ২৭ হাজার আসামি জামিন পেয়েছে সেই সময়ে সাধারণভাবে আদালত চললে ৫ থেকে ৬ হাজার জামিন পেত।”

দেশের ৬৮টি কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে সব মিলিয়ে এখন ১০ থেকে ১২ জন কোভিড-১৯ রোগী আছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কারা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

আক্রান্তরা সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনদের তত্ত্বাবধানে কারাগারের বাইরে নির্ধারিত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

তবে এ পর্যন্ত কারাগারগুলোতে মোট কতজন বন্দি আক্রান্ত হয়েছেন, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক আবরার হোসেন বলেন, কারাগারে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তারা ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ অবলম্বনের চেষ্টা করছেন।

“প্রতিটি বন্দির স্বাস্থ্যের প্রতি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নজর রাখা হচ্ছে।”

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম জানান, নতুন বন্দিরা এলে তাদের পৃথক পৃথক কক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময় আইসোলেশনে রাখা হয়। এর মধ্যে যাদি কারও মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে দ্রুত তাকে আলাদা করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কোনো বন্দি করোনাভাইরাস আক্রান্ত না থাকলেও পাবনা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের কয়েকটি কারাগারে বন্দিদের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে। তাদের কেউ কেউ সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন বলে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মাহবুবুল ইসলাম জানান, কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে অন্য রোগে আক্রান্ত বন্দিদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে তাদের বেশ কয়েকজন কারারক্ষী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখনও বেশ কয়েকজন বন্দি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে তাদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে কারারক্ষীরা ঝুঁকিতে রয়েছেন।

কারা কর্মকর্তারা জানান, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে গত প্রায় তিন মাস ধরেই তারা কোনো বন্দির সঙ্গেই স্বজনদের সরাসরি দেখা করার সুযোগ দিচ্ছেন না। বন্দিদের কেউ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাদের জন্য নির্দিষ্ট করা মোবাইলে কথা বলতে পারছেন।

তবে এক্ষেত্রেও কিছু বিধি-নিষেধ আছে জানিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম বলেন, কোনো বন্দি সপ্তাহে একদিন ৫ মিনিট কথা বলতে পারবেন। এজন্য তাকে প্রতি মিনিটের জন্য ১ টাকা করে দিতে হবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে স্ত্রী, স্বামী, সন্তান, ভাই, বোন আর বাবা-মা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি, খুনিসহ আলোচিত ব্যক্তিদের কথা বলার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ রয়েছে জানিয়ে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক আবরার হোসেন বলেন, “বন্দিরা কার সাথে কথা বলবে সে বিষয়টিতেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব কথাই রেকর্ড করা হয়ে থাকে।

“আপাতত আমরা এ ধরনের বন্দিদের সাথে কারো কোনো যোগাযোগ করার সুযোগ দিচ্ছি না।”

এদিকে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ বন্ধ হওয়ায় মোবাইলে বন্দিদের সঙ্গে যোগাযোগে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন তাদের স্বজনরা।

মোহাম্মদপুরের একটি মাদক মামলার আসামি জাবেদ গত ১৫ দিন ধরে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। তার স্বজনরা কারাগারে গিয়ে জানতে পারেন, দেখা করার কোনো সুযোগ নেই। কথা বলা যাবে ফোনে। এরপর তাদের কথাও হয়েছে দুই দফায়।

জাবেদের মা সালেহা জানান, বেশ কয়েক দিন আগে পুলিশ তার ছেলেকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। জামিনের চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। উকিলের পেছনে ১০ হাজার টাকা খরচ করেছেন।

“কারাগারে নেওয়ার পর দেখা করতে একবার গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো সুযোগ পাইনি। পরে একটি ফোন আসে, সেই ফোনে ছেলের সাথে কথা বলে মনে হয়েছিল ছাড়া পেয়ে গেছে।

“কিন্তু না, সে কারাগার থেকে কথা বলছে জানিয়ে একটি বিকাশ নম্বর দেয়। ওই নম্বরে দুই হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।”

মারামারির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কাশিমপুর কারাগারে থাকা আসলামের বাবা ঢাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামাদ আলী বলেন, ছেলে কারাগারে ভালো আছে।

“বিকাশে টাকা পাঠাচ্ছি। ফোনে কথা হচ্ছে। এখন করোনাভাইরাসের কারণে সময়টা খারাপ। পরিস্থিতি একটু ভালো হলে জামিনের চেষ্টা করব।”

কারা কর্মকর্তা আবরার হোসেন জানান, বন্দিদের কাছে কয়েকটি বিকাশ নম্বর দিয়ে রাখা হয়েছে। সেই নম্বরে টাকা আসলে তা হিসাব রাখা হয়। সেই টাকা দিয়ে বন্দিরা ক্যান্টিনে পছন্দের খাবার খেতে পারেন। আবার ফোনে কথা বলার জন্য যে ব্যয় হয় সেটাও দিতে পারেন।

এখন কারাগারের অধিকাংশ কাজই অনলাইনে হয়ে থাকে বলে জানান জেলার মাহবুবুল ইসলাম।

“কোনো জামিনের ব্যাপারে ওকালতনামা বা প্রয়োজনীয় কাগজে বন্দির স্বাক্ষরের প্রয়োজন হলে সেজন্য আইনজীবীর আসার সুযোগ নেই। আদালতের মাধ্যমে কাগজ আসবে। সেভাবেই আদালতে যাবে। সেখান থেকে আইনজীবী সংগ্রহ করবেন,” বলেন তিনি।

বিকাশে বন্দিদের জন্য টাকা পাঠানোর পর সেখান থেকে ‘কমিশনের’ নামে কেটে নেওয়া বা বন্দিদের কথা বলার ক্ষেত্রে কাউকে বেশি সুযোগ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অস্বীকার করেন কর্মকর্তারা।

এসব অভিযোগ আসা মাত্রই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে বলে দাবি করেন তারা।

“এখন সব কিছুই আধুনিকায়ন হচ্ছে, ডিজিটাল হচ্ছে। ফলে নিয়ম বর্হিভূত কাজ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স,” বলেন আবরার হোসেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here