করোনায় পশুর হাটে হাহাকার, অনলাইনে ক্রেতা বেশি

0
25

স্টাফ রিপোর্টার: একদিন পর ঈদুল আজহা। অথচ এখনো জমেনি রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলো। করোনা সংক্রমণের মধ্যে এবার ঢাকার আশপাশের খামারিদের মধ্যে অধিকাংশই হাটে যাননি। তারা এবার খামার থেকেই পশু বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে থেকেও এবার পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা গরু-ছাগল আনতে পারছেন না। কিছু ব্যবসায়ীরা অল্প করে আনছেন, তবে হাটে ক্রেতাদের আনাগোনা নেই। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাটে আসা ব্যবসায়ীরা। তবে এবার অনলাইনে গত বছরের তুলনায় বেশি ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে।

সরজমিনে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটসহ বেশ কয়েকটি হাট ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাটগুলোতে অল্প কিছু কোরবানির পশু আসলেও ক্রেতা একেবারেই হাতেগোনা। যারা আসছেন তারা হাটের পরিবেশ ও গরুর দাম শুনে চলে যাচ্ছেন। কেনাবেচা শুরু না হওয়ায় গরু বিক্রি করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিক্রেতারা। বিক্রেতারা জানান, করোনার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এবার মানুষ অভাবে পড়েছেন। তাই ক্রেতা কম। তবে বাজারে ছোট গুরুর চাহিদা আছে। যারা ২ লাখ টাকার দামের পশু কোরবানি করতেন তারা এবার ৭০-৮০ হাজারের পশু কেনার চিন্তা করছেন। ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, চাহিদার তুলনায় এবার দেশে ৩০ ভাগ বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে এ বছর ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কোরবানি কম হবে বলে ধারণা করা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে গত বছরের তুলনায় পশু বিক্রিও ৫০ শতাংশ কম বলে আশঙ্কা তাদের।

তবে এবার অনলাইনে গত বছরের তুলনায় তিনগুন বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মাস এসোসিয়েশন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান বলেন, হাটে ক্রেতাদের সাড়া না থাকলেও এবার অনলাইনে গতবারের চেয়ে তিনগুন বেশি গরু বিক্রি হয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যারা ঢাকায় পশু নিয়ে এসেছেন তারা বিপাকে পড়েছেন। সিরাজগঞ্জ থেকে গাবতলীতে আসা গরু বিক্রেতা একাব্বর আলী বলেন, ৫জন শেয়ারে সিরাজগঞ্জ থেকে ১২টি গুরু এনেছি। একদিকে ট্রাক ভাড়া বেশি অন্যদিকে গরুর চাহিদা কম শোনা যাচ্ছে। সেজন্য অল্প করে গরু এনেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত হাটে ক্রেতার দেখা পাচ্ছি না। দুই একজন আসে। তারা দেখে চলে যায়। এ অবস্থায় আমরা চিন্তার মধ্যে আছি। কোরবানি উপলক্ষে আমাদের একটু বেশিই লাভ করার চিন্তা থাকে। কিন্তু যে অবস্থা দেখছি তাতে লাভতো দূরের কথা, কোনমতে বিক্রি করতে পারলে যেন বাঁচি।

মোহাম্মদপুরের মেঘডুবি এগ্রো প্রতি বছর কোরবানির হাটেই বেশি গরু বিক্রি করে। কিন্তু এবার তারা হাটে একেবারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মেঘডুবির পরিচালক মো. হাসান বলেন, আমরা এবার হাটে যাচ্ছি না। খামার থেকেই যতোটুকু সম্ভব বিক্রি করার চিন্তা করছি। করোনা সংক্রমণের কথা চিন্তা করেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু এখনো ক্রেতারা সেরকম আসছেন না। তবে যারা কোরবানি উপলক্ষে ব্যবসা করেন তারা আমাদের থেকে দুই একটা গরু নিয়ে হাটে তুলছেন। এদের সংখ্যাও গতবারের তুলনায় খুবই কম। কেরানিগঞ্জের রাখাল বাড়ি এগ্রোর মালিক ফয়সাল আহমেদ বলেন, সরাসরি আমরা বাজারে যাচ্ছি না। খামার থেকে যতোটুকু বিক্রি করা যায়। এক্ষেত্রে আমরা অনলাইনের সাহায্য নিচ্ছি এবার। ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আমাদের প্রচারণা চলছে। এতে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন। তবে বিক্রি তেমন হয়নি। গত বছর এই সময়ে অনেক গরু বিক্রি করেছি। সেই তুলনায় এবার বিক্রি নেই।

করোনার কারণে এবার সবাই অর্থ সংকটে পড়েছেন। যেসব ক্রেতারা আগে ২ লাখ টাকার গরু কোরবানি করতেন, এবার তারা ৭০-৮০ হাজার টাকার গরু খোঁজেন। যারা আগে শেয়ারে কোরবানি দিতেন তারা হয়তো এবার কোরবানিই দিচ্ছেন না। এবছর করোনার থাবায় অনেক সামর্থবান পরিবারও টানাপোড়েনে পড়েছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা প্রতি বছর কষ্ট করে হলেও কোরবানি দিতেন। কিন্তু এবার মহামারিতে অর্থ সংকটে তাদের অনেকেই কোরবানি করতে পারছেন না। একারণে পশুর হাট এখনো জমেনি।

রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার ঈদুল আজহায় অনেকেই কোরবানি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যারা প্রতিবছর ২ লাখ টাকার গরু কোরবানি করতেন তারা এবার ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার গরু খুঁজছেন। যারা শেয়ারে গরু কোরবানি করতেন তাদের অধিকাংশই এবার ছাগল কোরবানি দেয়ার চিন্তা করেছেন। আর যারা কষ্ট করে কোনমতে ছোট একটি ছাগল কোরবানি দিতেন তারা এবার কোরবানিই করছেন না।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন, হাটের ঠিকাদার ও খামারিদের দেয়া তথ্য মতে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত বাজারে অর্ধেকের কম গবাদিপশু বিক্রি হয়েছে। গত বছরও হাটে তোলা গবাদিপশুর ১০ শতাংশ বিক্রি হয়নি। প্রায় ১০ লাখ গরু-ছাগল বিক্রি করতে না পেরে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েন। দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগে সারা দেশে দিনে ৪৫ কোটি টাকার গরু কেনাবেচা হয়েছে। সাধারণত মাংস বিক্রির জন্য কসাইদের কাছে এসব গরু বিক্রি হয়। কিন্তু গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দিনে গড়ে ১০ কোটি টাকার বেশি গরু কেনাবেচা হয়নি। সরকার এবার কোরবানির হাটের যে চাহিদা নিরূপণ করেছে, তা থেকেও ২০ শতাংশ গবাদিপশু কম বিক্রি হবে। কারণ করোনাকালে অনেক মানুষই অভাবে পড়েছেন। ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান বলেন, গত কয়েকমাস ধরে পশু বিক্রি অনেকটা বন্ধ রয়েছে। লকডাউন থাকায় হাট বন্ধ ছিলো। এতে অনেক গরু-ছাগল অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে। এবার চাহিদার তুলনায় পশুও অনেক বেশি। তাছাড়া মানুষ এবার অর্থ সংকটে পড়েছে। অনেকে কোরবানি দেবে না। তাছাড়া করোনা সংক্রমণের ভয় রয়েছে। তাই হাট আর আগের মতো হয়তো জমবে না। তবে এবার বড় গরুর চেয়ে ছোট গরুর চাহিদা বেশি। এজন্য বড় গরু বিক্রি নিয়ে সমস্যা হতে পারে। কারণ অধিকাংশই এবার ছোট দেখে কোরবানি দিচ্ছেন। তারপরও কোরবানির এখনো দু’দিন বাকি আছে। দেখা যাক কি হয়। শেষের দিকে হয়তো আরো জমবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here