বেড়েই চলছে দেশের নদীর পানি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

0
25

স্টাফ রিপোর্টার: ভারী বৃষ্টির কারণে একের পর এক নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে যাচ্ছে। আজ দেশের ১৭টি নদীর ৩০টি পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ওপরে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল ১৭ নদীর ২৮ পয়েন্টে। এদিকে বন্যা উপদ্রুত জেলা, উপজেলা আর ইউনিয়নের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিদিন। গত ২৪ ঘণ্টা পানিতে ডুবে আরও ৩ জন মারা গিয়েছে।

আগামীকাল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। বৃষ্টির কারণেই আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘন্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পূবাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। যদিও এখন সুরমা ছাড়া সব নদীর পানি স্থিতিশীল আছে। কিন্তু ভারী বৃষ্টির ফলে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, উত্তরাঞ্চলের ধরলা ও তিস্তা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা ও পার্বত্য এলাকার অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতিসহ নতুন বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হবার শংকা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা।

নদীগুলোর অবস্থা:

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম পয়েন্টে পানি গতকাল মঙ্গলবারের (২১ জুলাই) তুলনায় বিপৎসীমার ৩৫ ৩৫ থেকে বেড়ে ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার (২২ জুলাই) ব্রহ্মপুত্র নদীর নুনখাওয়া পয়েন্টের পানি ২৬ থেকে বেড়ে ৪০, চিলমারী পয়েন্টেও ৪২ থেকে বেড়ে ৫১, ঘাঘট নদীর গাইবান্ধা পয়েন্টে ৪৩ থেকে বেড়ে ৪৮, করতোয়া নদীর চকরহিমপুর পয়েন্টের পানি নতুন করে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহতি হচ্ছে।

এদিকে যমুনা নদীর পয়েন্টগুলোতে পানি বিপৎসীমার ওপরে হলেও আগের তুলনায় পানির উচ্চতা কমছে। যমুনার ফুলছড়ি পয়েন্টে ৭২ থেকে বেড়ে ৭৫, বাহাদুরাবাদ পয়ন্টে নতুন করে ৮২, সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ৮৮ থেকে কমে ৮৪, কাজিপুর পয়েন্টে ৭৪ কমে ৬৩, সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ৬৯ থেকে কমে ৬১, আরিচা পয়েন্টে ৬৮ থেকে কমে ৬০, আত্রাই নদীর বাঘাবাড়ি পয়েন্টে ১০০ থেকে কমে ৯৭, সিংড়া পয়েন্টে ৬৭ থেকে বেড়ে ৭৪, ধলেশ্বরী নদীর জাগির পয়েন্টে ৪৮ থেকে বেড়ে ৭১, এলাসিন পয়েন্টে ১০৮ থেকে কমে ১০১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এখন প্রবাহিত হচ্ছে। লাক্ষ্যা নদীর নারায়ণগঞ্জ পয়েন্টে ৭ থেকে বেড়ে ১০, কালিগঙ্গা নদীর তারাঘাট পয়েন্টে ৮৭ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পদ্মা নদীর বেশিরভাগ পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ওপরে হলেও আগের তুলনায় পানির উচ্চতা কমেছে অনেক জায়গায়। পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে ১০৫ থেকে কমে ১০৪, ভাগ্যকূল পয়েন্ট ৭২ থেকে বেড়ে ৭৫, মাওয়া পয়েন্টে ৬৬ থেকে কমে ৬৫ এবং সুরেশ্বর পয়েন্টে ১৯ থেকে বেড়ে ৩৫ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে ৭৫ থেকে কমে ৭৪, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ২৫ থেকে বেড়ে ৩০, পুরাতন সুরমা নদীর দিরাই পয়েন্টে ১৪ থেকে বেড়ে ২৮, যাদুকাটা নদীর লরেরগড় পয়েন্টে ১ থেকে বেড়ে ৬৮, তিতাস নদীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পয়েন্টের পানি নতুন করে বিপৎসীমার ৭ পয়েন্ট ওপরে, সোমশ্বেরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টের পানি ২৭ এবং মেঘনা নদীর চাঁদপুর পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ২৯ থেকে বেড়ে ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুইয়া জানান, ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা এই পানি বৃদ্ধি অব্যহত থাকতে পারে। অন্যদিকে যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও আগামী ২৪ ঘন্টায় বৃদ্ধি পেতে পারে। গঙ্গা ও পদ্মা নদীগুলোর পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এদিকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি বাড়ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। এদিকে ঢাকা জেলার আশেপাশের নদীগুলোরও পানি বাড়তে পারে আগামী ২৪ ঘণ্টা। এসময় তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্টে এবং বালু নদীর ডেমরা পয়েন্টে বিপৎসীমার অতিক্রম করতে পারে।

এদিকে জেলাগুলোর মধ্যে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিলেট,সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনা জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এছাড়া বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ,নাটোর, মানকিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারিপুর, রাজবাড়ি, শরীয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্রের স্টেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে লররেগড়ে ১৪২ মিলিমিটার। এছাড়া মহেশখোলায় ২৪০, কক্সবাজারে ১৩৯, সুনামগঞ্জে ১২০, লালাখালে ১৩৭, কুমিল্লায় ১০০, ভাগ্যকুলে ১৩৩, রাঙ্গামাটিতে ৯৩ এবং লামায় ৯১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ১১৭ মিলিমিটার, জলপাইগুঁড়িতে ৬১, আগরতলায় ৬০ এবং শিলংয়ে ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।

ক্ষয়ক্ষতি:

এদিকে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২২ জুলাই বন্যায় উপদ্রুত জেলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১, গতকাল ছিল ২০ জেলা। একইভাবে বেড়েছে উপজেলার সংখ্যা। ৯৮ থেকে বেড়ে আজ ১০২ এ দাঁড়িয়েছে, ইউনিয়নের সংখ্যা বেড়ে ৬০৩ থেকে ৬৫৪টি। অর্থাৎ আজ ২১ জেলার ১০২টি উপজেলার ৬৫৪টি ইউনিয়ন বন্যা উপদ্রুত এলাকায় পরিণত হয়েছে। জেলাগুলো হচ্ছে- লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ি মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, ফেনী, শরীয়তপুর, ঢাকা ও নওগাঁ।

এদিকে এসব জেলার মোট ৭ লাখ ৩১ হাজার ৯৫৮ পরিবার এখন পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছে। এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০ লাখ ৪০ হাজার ৩৪ জন মানুষ। এদিকে বন্যায় গত ২৪ ঘন্টায় বন্যার পানিতে ডুবে আরো তিনজন মারা গেছে।আজ মৃত্যুর সংখ্যা ২৫ জন। গতকাল পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে মারা যাবার সংখ্যা ছিল ২২ জন। এর মধ্যে জামালপুরে ৯ জন, লালমনিরহাটে ১ জন, সুনামগঞ্জে ৩, সিলেটে ১ এবং কুড়িগ্রামে ৭ জন, টাঙ্গাইলে ৩ জন এবং মানকিগঞ্জে ১ জন। সরকারিভাবে মোট ১ হাজার ৫৪৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে মোট ৬৯ হাজার ৪৬২জন আশ্রয় নিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here