‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি কি বিচার পাবো না?

0
73

স্টাফ রিপোর্টার: ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি কি বিচার পাবো না?।’ সাংবাদিক সাজিদা ইসলাম পারুলের হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন-সাংবাদিক হয়েও বিচার পাইনা; সাধারণ মানুষ কি করবে? এমন প্ল্যাকার্ড হাতেই করোনাকালে কোনো উপায়ান্তর না দেখে বুধবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে নির্যাতন, যৌতুক দাবি ও ভ্রুণ নষ্ট করার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক স্বামী রেজাউল করিম প্লাবনের গ্রেফতারের দাবি জানালেন পারুল।

এক পর্যায়ে অশ্রুসিক্ত তার দুচোখ। বুকে পাথরচাপা কষ্ট আর ভেজা চোখেই আক্ষেপ করে পারুল বললেন, ‘আমি যদি সাংবাদিক হয়ে এত দিনেও বিচার না পাই, তাহলে দেশের সাধারণ মেয়েরা কোথায় যাবে? অনেক নারী নীরবে নির্যাতন সহ্য করেন, আবার কেউ নির্যাতনের বিচার চাইলেও প্রভাবশালীদের চাপে আসামিরা ধরা পড়ে না। নিজের জীবন দিয়ে তা উপলদ্ধি করছি।’

প্রেস ক্লাবের যে আঙিনায় দাঁড়িয়ে পারুল তার ওপর বর্বর নির্যাতনের বিচার চাইলেন- এটা সংবাদকর্মী হিসেবে তার খুব পরিচিত অঙ্গন । এখানেই কত বিচার প্রত্যাশীর কথা শুনে নিজের নোট বুকে লিখে নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছেন পারুল। কী দুর্ভাগ্য- এমন চেনা আঙিনায় দাঁড়িয়ে অন্য সহকর্মীর কাছে পারুল শোনালেন- নিজেই অমানবিকতার শিকার হয়ে তার বিচার না পাওয়ার করুণ কাহিনী। এ সময় অনেক সহকর্মী তাকে সান্ত্বনা দেন। তাদের কারও কারও চোখও ছিল অশ্রুসিক্ত।

সংবাদকর্মী হলে কি হবে তারাও তো রক্তে-মাংসের মানুষ! তবে কোনো সান্ত্বনা পারুলকে প্রবোধ দিতে পারছিল না। পারবে কি করে, যারা তার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে. তারা কখনো হুমকি দিচ্ছে, কখনো সমঝোতার জন্য চাপ দিচ্ছে। অজানা শঙ্কা নিয়ে প্রতিটি দীর্ঘ রাত শেষে ভোর আসে পারুলের জীবনে।

পারুল অভিযোগ করেন, প্রতিনিয়ত সমঝোতার চাপ, হুমকি ও তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করার চেষ্টা করছে প্লাবন

প্লাবনকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে সারা দেশে নানা শ্রেণী-পেশার অনেকে আন্দোলন করতে চেয়েছিলেন। মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু করোনাকালে সবাই রাস্তায় নেমে আন্দোলন করুক, তা চাননি পারুল। এ কারণে তিনি একাই প্রেস ক্লাবের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করার দাবি জানালেন। বেলা ১১টা-১২টা পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালন করেন পারুল। তার হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি কি বিচার পাবো না?/ যৌতুক দাবি, নির্যাতন ও ভ্রূণ হত্যাকারী প্লাবনের গ্রেপ্তার চাই।’

পারুলের অভিযোগ করেন, প্রতিনিয়ত সমঝোতার চাপ, হুমকি ও তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করার চেষ্টা করছে রেজাউল করিম প্লাবন। এক মাস পনের দিন হয়েছে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলা করেছেন। বিচার চেয়ে কত ধরণা দিচ্ছেন। প্লাবন ঢাকা শহরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ পুলিশ নাকি তাকে খুঁজে পায় না!

তিনি সাংবাদিক নেতাদের কাছেও বিচার পেতে সহায়তার অনুরোধ করেন। বলেন, ‘আমি আপনাদের ছোটবোনের মতো। আমার জায়গায় নিজের বোনটিকে ভাবুন, কন্যাটিকে ভাবুন। যদি আপনার বোন বা মেয়ে যৌতুকের জন্য নির্যাতিত হতো, তার গর্ভের অনাগত সন্তানটিকে হত্যা করা হতো, কী করতেন আপনি?

পারুল বলেন, ‘কতিপয় সাংবাদিক নেতার প্রশ্রয় এবং পুলিশ প্রশাসনের অবহেলা কাজে লাগাচ্ছে প্লাবন। প্রতিনিয়ত সমঝোতার চাপ, হুমকি, ফেসবুক আইডি হ্যাক করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক দিন দেখবেন, পুরো আমাকেই গায়েব করে দেবে সে। তাই উপায়ান্তর না দেখে ন্যায়বিচারের দাবিতে আজ একাই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়ালাম। আশা করছি পুলিশের টনক নড়বে।’ এসব বলতে বলতে এক সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

তিনি জানান, এরপরও বিচার না পেলে প্লাবনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে হাতিরঝিল থানার সামনে দাঁড়াবেন। প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির সামনে এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছেও বিচার চাইতে দাঁড়াবেন। তাতেও কাজ না হলে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করবেন তিনি। বিচারহীনতার এই সমাজে বেঁচে থাকার চেয়ে প্রতিবাদ করে মরে যাওয়া ভালো।
বিচার চেয়ে কান্নায় বুক ভাসান নির্যাতনের শিকার সাজিদা ইসলাম পারুল যৌতুক দাবি, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে গত ১১ মে হাতিরঝিল থানায় প্লাবনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন পারুল। মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২ এপ্রিল যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার প্লাবনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। বিয়ের পর যৌতুক হিসেবে প্লাবন ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট দাবি করেন পারুলের কাছে। একাধিক নারীর সঙ্গে প্লাবনের অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা জেনে যান পারুল। অনৈতিক সম্পর্কে বাধা ও যৌতুক না দেওয়ায় তাকে নির্যাতন করা হয়। মারধরের কারণে পারুলের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ৫ মে তিনি প্লাবনের গ্রামের বাড়ি গেলে সেখানেও মারধরের শিকার হন। প্লাবনের বড় ভাই এমএ আজিজ, ছোট ভাই এসএম নিজামউদ্দিন এবং বাবা সামসুল হক ও মারধর করেন পারুলকে। এরই মধ্যে প্লাবনকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একাধিক সংগঠন বিবৃতি দিয়ে আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে।

পুলিশ প্রশাসনের ভাষ্য : আসামি গ্রেফতারের ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বুধবার সমকালকে বলেন, মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের আসামিদের গ্রেফতারের ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে রিকুইজিশন স্লিপ কুড়িগ্রামে পাঠানো হয়। আসামিরা ঢা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে নানা উপায়ে খোঁজা হচ্ছে।

রংপুরের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, মূল আসামি প্লাবন ঢাকায় পালিয়ে গেছে। অন্যরা কুড়িগ্রামে নেই। পুলিশ আসামিদের বাসায় অভিযানে গিয়েছে।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন-অর-রশিদ বলেন, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। আসামিদের গ্রেফতারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আসামিদের গ্রেফতারে দীর্ঘসূত্রীতার নেপথ্যে কোনো অদৃশ্য শক্তির চাপ রয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশিদ বলেন, আসামিদের না ধরার ব্যাপারে কোনো চাপ নেই। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা পুলিশ চালাচ্ছে।

ওসি আরও বলেন, আসামি ধরার জন্য পুলিশের তিন সদস্যের একটি টিম করা হয়েছে। অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আশা করি দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

শুরু থেকেই অভিযোগ আছে, অনেক আগেই হাতিরঝিল থানা থেকে আসামি গ্রেফতারে রিকুইজিশন স্লিপ কুড়িগ্রামে পাঠানো হলেও চিলমারী থানার ওসি গ্রেফতার অভিযানে যাওয়ার আগেই আসামিদের তথ্য জানিয়ে দিচ্ছেন। লোক দেখানো অভিযানের পর আবার আসামিরা নিজ বাসায় নির্বিঘ্নে বসবাস করছেন। কুড়িগ্রামের স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অদৃশ্য চাপে আসামি গ্রেফতারে গড়িমসি করছে। আবার ঢাকার হাতিরঝিল থানা পুলিশ তথ্য প্রযু্িক্ত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত না করে অভিযানের নামে ইঁদুর-বিড়াল খেলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here