যাবজ্জীবন হচ্ছে জাল নোটের কারবারির শাস্তি

0
66

স্টাফ রিপোর্টার: জাল টাকার প্রচলন প্রতিরোধে এবার আইন করা হচ্ছে। এতে মুদ্রা বা নোট জালকারী, জাল নোট সরবরাহ, পাচার, লেনদেন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত ‘জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ আইন, ২০২০’ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ আইনের খসড়া সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে আপলোড করে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত চাওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৩০ জুনের মধ্যে অংশীজনদের মতামত নিয়ে এরপর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে আইনটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে।

জানা গেছে, জাল নোট প্রচলন প্রতিরোধ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সিআইডি, এনএসআই ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ছয় সদস্যের একটি উপ-কমিটি করা হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। ওই কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। সে বার মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন সংশোধনের প্রস্তাব দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। সবশেষ এ মাসে পুনরায় খসড়া চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেটিকেই এখন পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ দিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

প্রস্তাবিত খসড়া আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যত বেশি নকল মুদ্রা তৈরি বা সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হবে তার দণ্ড হবে তত বেশি। এ ছাড়া একই ব্যক্তি একাধিকবার এই আইনে অপরাধী হলেও দণ্ড বেড়ে যাবে। এতে সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আইনের খসড়ায় জাল মুদ্রা সংক্রান্ত বেশকিছু কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো- মুদ্রা জালকরণ, জাল মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়, জাল মুদ্রাকে খাঁটি বলে ব্যবহার বা লেনদেন, আইনানুগ উদ্দেশ্য ব্যতীত জাল মুদ্রা দখলে রাখা, জাল মুদ্রা বিদেশ হতে দেশে বা দেশ হতে বিদেশে সরবরাহ বা পরিবহন বা পাচার, ব্লিচড বা টেম্পার্ড বা মিসম্যাচড মুদ্রা প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয় ও পাঞ্চড মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনে ব্যবহার বা বহন বা দখলে রাখা।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রিন্ট বা মিন্ট কর্তৃক বাতিলকৃত বিকৃত মুদ্রা বাজারজাতকরণ বা লেনদেনে ব্যবহার, জাল মুদ্রা তৈরির যন্ত্রপাতি বা উপাদান বা দ্রব্যাদি প্রস্তুত বা সরবরাহ বা আমদানি-রফতানি বা পাচার বা মেরামত বা বহন বা সংরক্ষণ বা ক্রয়-বিক্রয় করা। জাল মুদ্রা তৈরিকরণ সংক্রান্ত পদ্ধতি উদ্ভাবন বা এ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, জাল মুদ্রা তৈরি সংক্রান্ত ফাইলের হার্ড কিংবা সফট কপি দখলে রাখা, এই ধরনের অপরাধে যেকোনো উপায়ে সহায়তা করা। জাল অথবা আসল মুদ্রা সম্পর্কিত কোনো অসত্য গুজব ছড়ানো এবং বাংলাদেশি নতুন অথবা পুরাতন যেকোনো প্রকার মুদ্রা মুনাফা অর্জন, প্রতারণা অথবা অন্য যেকোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ক্রয়-বিক্রয় করাকেও অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব অপরাধের জন্য দণ্ডের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যত বেশি নকল মুদ্রা তৈরি বা সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হবে তার দণ্ড হবে তত বেশি। এ ছাড়া একই ব্যক্তি একাধিকবার এই আইনে অপরাধী হলেও দণ্ড বেড়ে যাবে।

আইনের খসড়া অনুযায়ী যেকোনো মূল্যের ১০০ পিসের কম জাল নোট পাওয়া গেলে দুই বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড, ১০০ পিসের অধিক কিন্তু ৫০০ পিসের কম নকল মুদ্রার জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এবং ৫০০ পিসের অধিক জাল নোট পাওয়া গেলে ৭ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকার জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

কোনো ব্যক্তি এই আইনের ধারায় দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে দণ্ড বেড়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে ১০০ পিসের কম জাল নোটের জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড, ১০০ থেকে ৫০০ পিস জাল নোটের জন্য ৭ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এবং জাল নোট ৫০০ পিসের বেশি হলে ১২ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকার জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

কোনো ব্যক্তি এই আইনের ধারায় তৃতীয়বার বা তার বেশিবার অপরাধ প্রমাণিত হলে ১০০ পিসের কম জাল নোটের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড, ১০০ থেকে ৫০০ পিস জাল নোটের জন্য ১২ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এবং ৫০০ পিসের অধিক জাল নোটের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এতদিন সিভিল পেনাল কোড অনুযায়ী জাল নোটের অপরাধীদের বিচার হতো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল যার কাছে জাল নোট পাওয়া যেত, তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হতো। তাই এর সাথে জড়িত অন্যদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হতো না। নতুন আইন হলে সে দুর্বলতা আর থাকবে না। এর সাথে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here