রংমহল-টর্চার সেল সবই ছিল সাহেদের

0
43

গ্লোবালভিশন ডেস্ক: ‘কর্মমুক্তি কর্মসংস্থান সোসাইটি’ ও ‘মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ’ এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের নামে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মো. সাহেদ। ঋণ কার্যক্রমের বৃদ্ধ কর্মকর্তার অভিযোগে বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে নানা অজানা কাহিনী। কিভাবে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হয় তাও বলেছেন অবলিলায়।

কর্মমুক্তিতে এক সময় চাকরি করতেন ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তার কর্মস্থল ছিল টঙ্গী শাখায়। একদিন সেই অফিসে অনেক ঋণগ্রহীতা এসে জড়ো হন। তারা ঋণ চান। তখন ওই বৃদ্ধ কর্মচারী জানান, সাহেদ স্যার টাকা অনুমোদন না করলে তারা ঋণ বিতরণ করবেন কীভাবে!

রংচং মাখিয়ে এ খবর পৌঁছানো হয় সাহেদের কানে। সাহেদকে বলা হয়, টঙ্গীর ব্রাঞ্চে তার নামে কুৎসা রটাচ্ছেন ওই বৃদ্ধ কর্মচারী। তখন ঢাকার অফিসে ডাক পড়ে তার। সাহেদের টর্চার সেলে সেই বৃদ্ধকে বেদম মারধর করে ওই দিনই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ঘটনা কী ঘটেছে, তা তার কাছে জানতেও চাওয়া হয়নি।

এভাবেই তুচ্ছ কারণে উত্তরায় সাহেদের টর্চার সেলে যখন-তখন চলত নির্যাতন। কোনো পাওনাদার গেলেও তার নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই মিলত না। রিজেন্টের কর্ণধার সাহেদের এই টর্চার সেলসহ জীবনের নানা অজানা কাহিনী সমকালকে গতকাল শনিবার বলছিলেন তার সাবেক কয়েকজন সহকর্মী। বিভিন্ন সময় হয় তারা নিজেরা চাকরি ছেড়েছেন অথবা তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

রিজেন্টের সাবেক এক নারী সহকর্মী বলেন, প্রায় নিয়মিত উত্তরার কার্যালয়ে রংমহল বসাতেন তাদের সাহেদ স্যার। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ও অনেক সুন্দরী নারী গাড়ি নিয়ে আসতেন সেখানে। মধ্যরাত পর্যন্ত থেকে চলে যেতেন তারা। প্রায়ই তার টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ আসত। তখন সাহেদের কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারী ছাড়া অন্যদের ওই কক্ষে ঢোকা নিষেধ ছিল।

সাহেদের বিয়ে নিয়েও জানা গেছে নানা তথ্য। মাঝে মধ্যে এক নারীকে নিয়ে অফিসে আসতেন তিনি। সহকর্মীদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন নিজের স্ত্রী হিসেবে। তবে ঝামেলা শুরু হয় আরেক ঘটনা থেকে। রিজেন্টের অ্যাকাউন্ট সেকশন থেকে মার্জিয়া আক্তার মুমু নামে একজনকে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন সাহেদ। কয়েক মাস পর মুমুকে রিজেন্টের অফিসেই একটি সুন্দর কক্ষে বসানোর ব্যবস্থা করেন সাহেদ। তার সুনির্দিষ্ট কী কাজ ছিল, কেউ জানেন না। তবে মাসে মাসে বেতন নিতেন তিনি। পরে অনেক কর্মী জানতে পারেন, মুমুকে বিয়ে করেছেন সাহেদ। যদিও তার আগেই পারিবারিকভাবে তিনি বিয়ে করেছিলেন সাদিয়া আরাবি রিম্মিকে। তাকে নিয়ে বনানীর ডিওএইচএসের বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। কর্মীদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত তার তিনটি বিয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অনেক নারীর সঙ্গেই ছিল অনৈতিক সম্পর্ক।

তবে সাহেদের স্ত্রী সাদিয়া বলেন, সাহেদের অন্য কোনো বিয়ের কথা তার জানা নেই। মার্জিয়া আক্তার মুমু তার অফিসের অ্যাকাউন্ট সেকশনে চাকরি করতেন।

সাহেদের সাবেক এক নারী ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জানান, হঠাৎ একদিন রাতে সাহেদ ফোন করেন তাকে। বলেন, একজন মডেলকে তার বাসায় কয়েকদিন রাখতে হবে। একপর্যায়ে ওই নারী পিএসকে রাতেই অফিসে ডেকে নেন তিনি। পরিচয় করিয়ে দেন নারী মডেলের সঙ্গে। তিনি তার অসুবিধা ও আপত্তির কথা জানানোর পরও সাহেদ জোর করে ওই মডেলকে পিএসের সঙ্গে বাসায় পাঠিয়ে দেন। ওই নারী মডেল পিএসকে জানান, সাহেদের সঙ্গে তার একটি টকশোতে পরিচয়। কিছু দিন ধরে তার স্বামী তাকে নানাভাবে নির্যাতন করে চলেছে। সাহেদ প্রভাবশালী লোক। তাই তার কাছে আশ্রয়ের জন্য এসেছেন। দুই রাত সাহেদের পিএসের বাসায় ছিলেন ওই নারী মডেল। তারপর মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন এসে ফিল্মি স্টাইলে মডেলটিকে তার বাসা থেকে নিয়ে যায়।

উত্তরাকেন্দ্রিক বিউটি পার্লার ও ম্যাসেজ সেন্টারের আড়ালে চলা অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গেও সখ্য রয়েছে সাহেদের। এ প্রসঙ্গে সাহেদের প্রতিষ্ঠানের আরেক নারী কর্মী জানান, তিনি যে বাসায় ভাড়া থাকতেন সেটির নিচ তলায়ও বিউটি পার্লারের আড়ালে এমন কাজ চলত। বিষয়টি টের পেয়ে বাড়ির মালিককে নোটিশ করে বিপদে পড়েন তিনি। ডিআইজি পরিচয়ধারী এক ব্যক্তি সাহেদের প্রতিষ্ঠানের সেই নারী কর্মীর বাসায় গিয়ে হুমকি দেন এই বলে যে, ভালো না লাগলে বাসা ছেড়ে চলে যান। বাড়ির মালিকও পুলিশ পরিচয়ধারী সেই কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে তাকে এক মাসের মধ্যে বাসা থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সাহেদের প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মী তখন তাদের বলেন, তাকে বাসা থেকে নামিয়ে দেওয়া হলে পুলিশের অন্যান্য ইউনিট ও সাংবাদিকদের তিনি বিষয়টি জানিয়ে দেবেন। এ কথা বলার কিছু সময় পরই তার কাছে সাহেদের ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে সাহেদ তাকে এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করতে বলেন।

রিজেন্টের একাধিক কর্মী জানান, প্রায় প্রতি রাতেই তাদের করপোরেট অফিসে ৩০-৪০ যুবক আসত। অনেক মাতালও থাকত তাদের মধ্যে। তাদের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করতেন সাহেদ। পরে রিজেন্টের স্থায়ী কর্মীরা জানতে পারেন, ওই যুবকরা ছিল সাহেদের কুইক রেসপন্স টিমের সদস্য। কোথাও ঝামেলা হলেই তারা সেখানে গিয়ে সাহেদের পক্ষে কাজ করত। সাহেদের অস্ত্রের কারবারও ছিল। নির্বিঘ্নে এই কারবার চালানোর জন্য তাদের ব্যবহার করা হতো। সাহেদের প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী জানান, দৃশ্যমান ব্যবসাগুলোর চেয়েও সাহেদ অদৃশ্য কারবার থেকে অনেক বেশি টাকা উপার্জন করেন। তার এরকম একটি অদৃশ্য কারবার হলো অস্ত্র কারবার।

সাহেদের প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ শাখায় কিছু দিন চাকরি করেছেন এমন এক কর্মী জানান, নানা ব্যাংকে সাহেদের অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ব্যাংক লেনদেনসংক্রান্ত বিষয় তাকে দেখভাল করতে হতো। তবে এটা করতে গিয়ে প্রায়ই ঝামেলায় পড়তে হয় তাকে। কারণ সাহেদ ব্যাংকের কাগজপত্রে পাঁচ ধরনের স্বাক্ষর করতেন। এটা নিয়ে অনেক ব্যাংক থেকে টাকা তুলতেও সমস্যায় পড়তে হয়। কেন সাহেদ একেক ব্যাংকের চেকে একেক ধরনের স্বাক্ষর করতেন, তা আজও অজানা তার কাছে। এ নিয়ে কেউ কখনও সাহেদকে প্রশ্নও করত না।

বিশ্বস্ত কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ কর্মীকে কয়েক দিন পরপর ছাঁটাই করতেন সাহেদ। দীর্ঘদিন চাকরি করলে তার প্রতারণার সব তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে- এ আশঙ্কায় কাউকে দীর্ঘ দিন তার কাছে রাখতেন না তিনি।

এখনও অধরা সাহেদ : এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি সাহেদকে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। একাধিক সংস্থা সাহেদের অবস্থান জানতে নজরদারি বাড়িয়েছে। গরুর পালের আড়ালে সাহেদ পাশের দেশে পালিয়েছেন কি-না, এ নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন।

এ ব্যাপারে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার বলেন, সাহেদকে গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। তার ব্যাপারে সীমান্তসহ সব জায়গায় অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়েছে। তার পালিয়ে যাওয়ার পথ নেই বললেই চলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here